দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা

দৈনিক নতুন বিশ্ববার্তা অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:৩৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২০

ফারুক হোসেন চৌধুরী
‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে, সেই আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম, কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি, কিভাবে এত বদলে গেছি এই আমি’– প্রথম যৌবনে কখন কোথায় কীভাবে এই গান শুনেছিলাম মনে নেই। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ আমি এই গানের প্রেমে পড়েছিলাম- ওই বয়সেই মনে হয়েছিল এই শিল্পী তো আমার কথাই বলছে। তার গায়কি, সুর- কন্ঠ মিলে সে হয়ে গেল আমার প্রিয় শিল্পী। জানলাম তার নাম আইয়ুব বাচ্চু। ব্যান্ডের গান করে। ব্যান্ড শিল্প তখন অল্প বয়সীদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। কিন্তু আমি সোলস এবং বাচ্চুর গানের পাগল। গ্রামের ছেলেরা রক- ব্যান্ড গানে তখনো অভ্যস্ত নয়। অথচ আমি উচ্চতার সাইজে ছোট হলেও ব্যান্ডের গানে উচ্চতর, সেজন্য কোন কোন বন্ধু রাগাতো নানা কথা বলে। কিন্তু আমি কিভাবে বলি সেই তুমি কেন অচেনা হলে- চল বদলে যাই- তুমি কেন বোঝ না- তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়- গানটি আমাকে গানে পাগলপ্রায় করে তুলেছিল এবং এখনো আমি প্রত্যহ এই গান শুনি এবং ভাবি কিছু কি? নিজেকেই প্রশ্ন করি, যে প্রশ্ন করতাম প্রথম যৌবনে- এখন মধ্য বয়সেও এই গানের আবেদন আমার কাছে বিন্দুমাত্র কমেনি। আমিও তখন আইযুব বাচ্চুর গান ছাড়া অসহায়। তখন বেশিরভাগ সময় বাচ্চুর ওই গানটিই শুনতাম। অন্যান্য গানও শোনার চেষ্টা করতাম। কিন্তু গ্রামে তখনো ব্যান্ডের গান শোনার যথাযথ ব্যবস্থা নেই। শহর থেকে তার গানের ক্যাসেট কিনে নিয়ে গ্রামের বাজারের এক দোকানদারের কাছে গিয়ে অনুরোধ করে তার কাছে ক্যাসেট প্লেয়ারে শুনতাম আইযুব বাচ্চু, সোলসের গান। এসএসসি পাশ করে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হলাম। আমার মনের আশা পূরন হলো নিজে ক্যাসেট প্লেয়ার কিনে আমি ইচ্ছামতো ব্যান্ডের গান শুনতে শুরু করলাম। অনেক গায়কের গান শুনি তখন। অনেককেই ভালো লাগে কিন্তু মন দখল করে আছে বাচ্চু ভাই। ততদিনে আইয়ুব বাচ্চু- বাচ্চু ভাই। ততদিনে বাচ্চু ভাই সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে গেছি যেমন চট্রগ্রামের ছেলে। তাঁর গিটার বাজানো মাতাল করতো। চট্রগ্রাম কলেজ থেকে ¯œাতক-¯œাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৭৬ সালে ‘আগলি বয়েজ ’ নামক ব্যান্ড গঠন করেন। ১৯৭৭ সালে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে যোগদান করেন। ১৯৮০ সালে সোলস ব্যান্ডে যোগদান করেন এবং প্রধান গিটার বাদক হন। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সোলসের সাথে ছিলেন।
১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল নিজের ব্যান্ড লিটল রিভার ব্যান্ড গঠন করেন যা পরবর্তী কালে এলআরবি নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। একজন একক শিল্পী হিসেবেও জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বি। তার প্রথম একক অ্যালবাম রক্ত গোলাম যা ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়।
১৯৬২ সালের ১৬ আগষ্ট জম্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু চট্রগ্রামে জম্ম গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে ১১তম জম্মদিনে বাবা আশরাক চৌধুরী তাকে একটি গীটার উপহার দেন। সেই গীটার তার জীবন পাল্টে দেয়। আগে থেকেই ব্যাপক ব্রিটিশ ও আমেরিকান রক ধাচের গান শোনা বাচ্চু নিজেই গীটার বাজানো শুরু করেন। তাকে গীটার শেখানো শুরু করেন চট্রগামে অবস্থানরত বার্মিজ জেকব ডায়াজ। ১৯৭৬ সালে বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে ইলেকট্রিক গীটার বাজানো শুরু করেন। গীটারটির প্রতি ভালোবাসা দেখে বন্ধু তাকে গীটারটি দিয়ে দেন।
১৯৭৭ সালে গীটার বাজানো দেখে জেমস তার ফিলিংস ব্যান্ডে যোগদান করতে বলেন। তিনি যোগদান করেন এবং ১৯৮০ সালে বাচ্চু সোলস ব্যান্ডে যোগদান করেন। সেখানে শুরু হয় তার সঙ্গীতের প্রকৃত মেধার বিকাশ। সোলসের সাথে চারটি ব্যান্ডে কাজ করেন। সোলসে তার প্রথম গান ‘ হারানো বিকেলের গল্প’।
১৯৯০ এর দশকের শেষ দিকে বাচ্চু সোলস থেকে বের হয়ে স্থায়ীভাবে ঢাকায় আসেন। ১৯৮৬ সালে মন দেন ঢাকার মেয়ে ফেরদৌস চন্দনাকে । চন্দনাকে নিয়ে তার কয়েকটি জনপ্রিয় গানও রয়েছে। এলআরবি নাম নিয়ে ১৯৯১ সালের এপ্রিলে প্রথম কনসার্ট করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসে তারা বাংলাদেশে প্রথম অ্যালবাম এলআরবি ১ এলআরবি-২ প্রকাশ করেছিল। ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে সাউন্ডটেক ইলেকট্রনিকস থেকে ‘কষ্ট’ বের হয়। অ্যালবামটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অনেকের মতে এটি বাচ্চুর সেরা অ্যালবাম। কষ্ট পেতে ভালোবাসি, কষ্ট কাকে বলে, জেগে আছি এই মধ্য বয়সে আমি প্রতিনিয়ম শুনি। এক বছরে তিনলাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। বাচ্চু ১৯৯৮ সালে এবি কিচেন নামের একটি ষ্টুডিও গঠন করেন ঢাকার মগ বাজারে। বাচ্চু ১৯৮৬ সালে যখন একক অ্যালবাম রক্ত গোলাম রেকর্ডের জন্য ঢাকায় আসে তখন সে তার এক বন্ধুর বাসায় গিয়েছিল। বন্ধুর বাসার আয়নায় ফেরদৌস চন্দনার ছবি লাগানো ছিল। সেই ছবি দেখেই বন্ধুকে বলেছিল ‘চন্দনাকে সে বিয়ে করতে চায়’। পরে চন্দনার সাথে তার দেখা হয় এবং প্রেমে পড়েন উভয়ে। বিষয়টি চন্দনার পরিবার জেনে যায় এবং বাচ্চুর সাথে দেখা করতে দিত না। ফেরারি মন গানটা মূলত চন্দনাকে নিয়ে গাওয়া। চন্দনাকে দেখতে সে প্রায় চট্রগ্রাম থেকে ঢাকায় আসত। ১৯৯১ সালের ৩১ জানুয়ারি চন্দনাকে বিয়ে করে। তাদের দুটি সন্তান আছে।
বাচ্চু এলআরবি সাথে এবং একজন একক শিল্পী হিসেবে প্রচুর অ্যালবাম করেছেন। তিনি বাংলাদেশের সেরা গীটার বাদক। তার সংগ্রহে ছিল অসংখ্য গীটার। ছয়বার মেরিল প্রথম আলো- চ্যানেল আই্ পুরস্কার জিতেছেন। ২০০৪ সালে বাচসাস পুরস্কর অর্জন করেন।২০১৭ সালে টেলে সিনে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার জিতেছিলেন। হার্ডরক, বলুজ রক, সাইকেডেলিক, সফট রক ধাচের গান করতেন। সুখ, ঘুমন্ত শহরে, স্বপ্ন, মন চাইলে মন পাবে, অচেনা জীবন, মানে আছি নাকি নাই,স্পর্শ, যুদ্ধ ব্যান্ড অ্যালবাম চাড়াও একক অ্যালবাম রক্ত গোলাম, ময়না, কষ্ট, সময়, একা, প্রেম তুমি কি, কাফেলা, প্রেম প্রেমের মতো, পথের গান, জীবন, জীবনের গল্প প্রভূতি একক অ্যালবাম বের করেন। এছাড়া সিনেমার গানেও কন্ঠ দেন। আম্মাজান সিনেমার আম্মাজান গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
আইয়ুব বাচ্চুর কষ্ট অ্যালবামের গানের মতো তার অজানা কষ্ট ছিল যা হয়ত কেবল সেই জানত। যার কারণে হুদরোগে আক্রান্ত হন। ফুসফুসে পানি জমার কারণে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। বাচ্চু চলে গেছে কিন্তু তার স্মৃতিকে স্মরণ করে রেখেছে তার প্রিয় শহর চট্রগামে ‘ রুপালি গিটার’ নামক স্মৃতি স্বম্ভ। মৃত্যুর পর চট্রগামেরই ফিরেছিলেন তিনি। চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশেন নিজের সন্তানকে ধরে রাখার জন্য ঔতিহ্যবাহী প্রবর্তক মোড়ে স্থাপন করেছে ভাস্কর্য ‘রুপালি গিটার।’ যিনি গেয়েছিলেন‘ এই রুপালি গিটার ফেলে /একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে/সেই দিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো/গোপান করে-’ হ্যাঁ বাচ্চু ভাই আজ ১৮ অক্টোবর আপনার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। লাখ লাখ শ্রোতা আপনার গান শুনে অশ্রু গোপন করতে পারলেও অনেক শ্রোতাই আপনাকে অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করবে। এই মধ্যবয়সে প্রতিনিয়ত বলা যায় প্রতিদিন আপনার গান শুনি অবসরে, কাজের ফাঁকে, কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও এমনকি একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্যও। আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার গানের মধ্যে। আপনি কখনো অচেনা হবেন না, বদলেও যাবেন না। হয়ত আমার সে বদলে গেছে, অচেনা হয়ে গেছে। ভালো থাকবেন বাচ্চু ভাই। লেখকঃ মোঃ ফারুক হোসেন চৌধুরী , সংস্কৃতিকর্মী ও উপ-পরিচালক, জনসংযোগ দপ্তর, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা।